এক্সরে

প্রযুক্তির জটিল টার্মগুলো কি আপনাকে বিভ্রান্ত করছে? কিছুতেই কি আপনার মস্তিষ্কে পাল্লা পড়ছে না? তাহলে বন্ধু, আপনি এবার সঠিক জায়গায় এসেছেন—কেনোনা এখানে আমি প্রযুক্তির সকল জটিল বিষয় গুলো ভাঙ্গিয়ে সহজ পানির মতো উপস্থাপন করার চেষ্টা করি, যাতে সকলে সহজেই সকল টেক টার্ম গুলো বুঝতে পারে।

দি আমাদের চোখ রেডিয়েশনের সুপার-এনার্জিক ফর্ম ডিটেক্ট করার ক্ষমতা রাখতো, তো আপনি কারোদিকে তাকালে তার চামড়ার ভেতরের হাড়হাড্ডি গুলো দেখতে পেতেন, এমনকি সে পকেটে করে বা ব্যাগে কি নিয়ে ঘুরছে, সবকিছুই আপনার চোখে ধরা পড়ে যেতো। আর সৌভাগ্যবসত আমাদের কাছে এমন এক টেকনিক রয়েছে, আমাদের চোখ সরাসরি এমনভাবে দেখতে না পেলেও এক্সরে বা রঞ্জন রশ্মি ব্যবহার করার মাধ্যমে মানুষের শরীরের ভেতর দেখতে পাওয়া সম্ভব।

বিজ্ঞানের অনেক মহান আবিস্কার গুলোর মতো এই এক্সরেও আবিস্কার হয়েছিলো ভুলবশত। এক পদার্থ বিজ্ঞানি তার ল্যাবে গ্যাস স্রাব টিউবে ইলেকট্রন বীম নিয়ে পরিক্ষা নিরিক্ষা চালাচ্ছিলেন, এই সময় হঠাৎ তার ল্যাবে থাকা ফ্লোরোসেন্ট স্ক্রীন জ্বলতে আরম্ভ করে, যখন ইলেকট্রন বীমটি অন করা হয়। যদিও এতে চমৎকৃত হওয়ার কিছু ছিল না, কেনোনা ইলেক্ট্রো ম্যাগনেটিক রেডিয়েশনের আয়তায় আসলে ফ্লোরোসেন্ট ম্যাটেরিয়াল প্রতিক্রিয়া জানাতে জ্বলে উঠে। —কিন্তু এখানে ব্যাপার ছিল, টিবটি চারিদিক থেকে হেভি বোর্ড দ্বারা ঘীরায়িত করা ছিল, ফলে রেডিয়েশন বাহির হওয়া সম্ভব ছিল না, সাথে তিনি আরো অবজেক্ট টিউব এবং স্ক্রীনের মাঝখানে রেখে দিলেন, যাতে রেডিয়েশন ব্লক হয়ে যায়। কিন্তু তারপরেও স্ক্রীন গ্লো করছিলো। বিজ্ঞানীর বুঝতে আর দেরি লাগলো না যে, সেখানে অত্যন্ত শক্তিশালী রেডিয়েশন তৈরি হচ্ছিলো। অবশেষে সে টিউবের সামনে তার হাত রাখলেন এবং দেখতে পেলেন, ফ্লোরোসেন্ট স্ক্রীনের মধ্যে তার হাতের হাড্ডির ছায়া দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। তো এভাবেই এক্সরে আবিষ্কৃত হয়ে যায় এবং এর সাথে সাথেই এর বেস্ট ব্যবহার সম্পর্কেও আমরা জেনে যাই।

শুধু মেডিক্যাল ক্ষেত্রে নয়, বর্তমানে বৈজ্ঞানিক গবেষণা, জ্যোতির্বিদ্যা, এবং শিল্পতেও এর উল্লেখ্যযোগ্য ব্যবহার করেছে। এই আর্টিকেল থেকে জানবো, এটি কিভাবে কাজ করে, এবং কোথায় কোথায় আমরা একে কাজে লাগাই। তো আর দেরি কিসের?

এক্সরে কি?

এক্সরে এবং দৃশ্যমান লাইট অনেকটাই এক জিনিষ। উভয়ই ইলেক্ট্রো ম্যাগনেটিক ফর্মে চলে এবং এই এনার্জিকে ফোটন বহন করে (যদি লাইট নিয়ে বিস্তারিত আর্টিকেলটি পড়ে থাকেন, তো অবশ্যই জানেন)। দৃশ্যমান আলো এবং এক্সরে উভয়ই অ্যাটমের মধ্যের ইলেকট্রনের নড়াচড়া থেকে উৎপন্ন হয়। যখন ইলেকট্রন তার কক্ষপথ থেকে নিম্নস্তরে নেমে আসে, ইলেকট্রন কিছু এনার্জি ত্যাগ করে, আর এই এনার্জি ফোটন আকারে ত্যাগ করে। যাই হোক, ইলেকট্রন ফোটন বুঝিয়ে আর আপনার মাথা ঘোল করবো না, এক কথায় বলতে এক্সরে হলো সাধারণ লাইটের সুপার পাওয়ার ফুল ভার্সন। সাধারণ আলোর মতো এটিও একই স্পীডে ভ্রমন করতে পারে। আপনি যদি কোন কাগজের টুকরাকে নির্দেশ করে এক্সরে লাইট ছুঁড়ে মারেন তো দেখতে পাওয়া যাবে সাধারণ আলোর চেয়ে এর তরঙ্গ দৈর্ঘ্য হাজার গুন ছোট। এর এনার্জি অনেক বেশি, তরঙ্গ দৈর্ঘ্য খাটো, এবং ফ্রিকুয়েন্সি অনেক বেশি হওয়াতে এটি এমন সকল বস্তুকে ভেদ করতে পারে, যেটা সাধারণ আলো ভেদ করতে পারে না।

আমরা জানি যে, গ্লাস বা প্ল্যাস্টিকের মতো ম্যাটেরিয়াল গুলো সাধারণ আলোকে সহজেই তাদের মদ্ধদিয়ে ভেদ করতে দেয়। কিন্তু অন্যান্য ম্যাটেরিয়াল যেমন- লোহা, কাঠ ইত্যাদি সাধারণ আলো ভেদ করতে পারে না। ঠিক একইভাবে কিছু ম্যাটেরিয়াল এক্সরে’কে তাদের মদ্ধদিয়ে ভেদ করতে দেয় এবং কিছু ম্যাটেরিয়াল এই রশ্মিকে গিলে মেরে ফেলে। কিন্তু কেন এমনটা হয়? —যখন রঞ্জন রশ্মি কোন ম্যাটেরিয়ালকে ভেদ করে অপরদিক দিয়ে বেড় হয়ে যেতে চায়, সেক্ষেত্রে এই রশ্মিকে অ্যাটমের সাথে অনেক লড়ায় করতে হয়। কোন ম্যাটেরিয়ালের মধ্যের অ্যাটমের ইলেক্ট্রনের কম্পমান জায়গার ফাঁক দিয়ে এই রশ্মি বেরিয়ে যায়। অর্থাৎ যে অ্যাটমে যতোবেশি ইলেকট্রন থাকবে, রঞ্জন রশ্মি ততো শোষিত হবে এবং ভেদ করে বেরিয়ে যেতে পারবে না।

এক্সরে সেই ম্যাটেরিয়াল গুলোকে আরামে ভেদ করতে পারে, যেগুলোর অ্যাটম অনেক হালকা এবং কোন সংখ্যক ইলেকট্রন থাকে; যেমন- আমাদের ত্বক, অথবা কার্বন নির্ভর অণু গুলো। কিন্তু যে অ্যাটমে অনেক ইলেকট্রন থাকে, সেখানে রঞ্জন রশ্মি মৃত হয়ে যায়।

ব্যবহার

মেডিক্যাল— মানুষ এক্সরের সর্বপ্রথম ব্যবহার মেডিক্যাল ক্ষেত্রে খুঁজে পায়, তাই একে অনেকে মেডিক্যাল টুল হিসেবেই জানেন। এটিকে রোগ নির্ণয় এবং চিকিৎসা, উভয় ক্ষেত্রেই ব্যবহার করা হয়। আমাদের শরীরের হাড় হাড্ডি, দাঁত—রঞ্জন রশ্মিকে শোষিত করে ফেলে, কিন্তু চামড়া, মাংস এক্সরেকে ভেদ করতে দেয়। এই জন্যই এক্সরে ফটোতে বডির ভেতরে কালো কালো ছায়া দেখতে পাওয়া যায়, কেনোনা সেটাকে ভেদ করতে পারে না। তবে এই ধরনের ফটো অত্যন্ত কাজের, ভাংগা হাড্ডি, টিউমার, যক্ষ্মারোগ, এমফিসেমা ইত্যাদি নির্ণয় করতে অত্যন্ত সাহায্য করে। তাছাড়া দাতের ডাক্তারেরাও এটি ব্যবহার করে বোঝার চেষ্টা করে, দাতের মারীর মধ্যে কি চলছে।

সিকিউরিটি— এক্সরে ঠিক যেভাবে মানুষের শরীরের বিভিন্ন অংশ দেখাতে সাহায্য করে, ঠিক তেমনিভাবে এটি ব্যাগের মধ্যে থাকা জিনিসপত্রও দেখতে সাহায্য করে। নরম ম্যাটেরিয়াল যেমন, লেদার, বেল্ট, প্ল্যাস্টিক ইত্যাদিকে এটি আরামে ভেদ করে, কিন্তু এর ভেতর যদি কোন বন্দুক, ছুরি বা কোন প্রকারের বিস্ফোরক থাকে, সেক্ষেত্রে  রঞ্জন রশ্মি ব্লক হয়ে যায় এবং তার লাইভ ছবি সিটি স্ক্যানারে চলা কম্পিউটারের স্ক্রীনে দেখতে পাওয়া যায়। সাধারণত এয়ারপোর্টে সিকিউরিটি টিম এই বড় বড় সিটি স্ক্যানার গুলোকে ব্যবহার করে।

শিল্পজাত ব্যবহার— রঞ্জন রশ্মি যদি শরীরের ভেতরের অঙ্গ আর ব্যাগে লুকিয়ে থাকা জিনিষ দেখতে পায়, তবে একই পদ্ধতি অবলম্বন করে এটি কোন মেশিনের ত্রুটি কেন খুঁজে পাবে না? একে বিভিন্ন মেশিনের মধ্যে থাকা ফাটল, ভাঙ্গা অংশ, ত্রুটি ইত্যাদি খুঁজে পাওয়ার জন্যও ব্যবহৃত করা হয়।

জ্যোতির্বিদ্যা— আমরা টেলিস্কোপের মাধ্যমে খুব সহজেই আমাদের গ্রহ থেকে বিভিন্ন গ্রহের দূরত্ব সহ আরো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গুলোকে মেপে ফেলি। কিন্তু রেডিও টেলিস্কোপ আবার ভিন্ন স্টাইলে কাজ করে, এটা অনেকটা রাডার আর স্যাটেলাইট ডিশের মতো, যেটা গ্রহ গুলো থেকে রেডিও তরঙ্গ গ্রহন করে, আর এই তরঙ্গ স্ট্যাডি করলে গ্রহের দূরত্ব বেড় করা যায়। অনুরুপভাবে, এক্সরে কেও স্পেসে পাঠিয়ে রেডিও টেলিস্কোপের ন্যায় গ্রহের দূরত্ব বেড় করা সম্ভব। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে আমাদের পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল স্পেস থেকে আসা এক্সরে’রে শোষণ করে নেয় আর পৃথিবীর পৃষ্ঠ পর্যন্ত পৌছাতেই দেয় না। তাই পৃথিবীর পৃষ্ঠে এই রশ্মিকে রিসিভ করা সম্ভব হবে না, স্পেসে কোন রিসিভার লাগিয়ে কাজ করতে হবে।

এটি কি ক্ষতিকর?

মনে করুন আপনি পড়ে গিয়ে পায়ে ব্যাথা পেয়েছেন, কিন্তু বুঝতে পারছেন না পা ভেঙ্গে গেছে কিনা! তাহলে কি করবেন? সহজ উত্তর, এক্সরে করে দেখবেন! কিন্তু যদি এই রঞ্জন রশ্মি না থাকতো? তাহলে? তাহলে, পায়ে কি হয়েছে চেক করার জন্য সার্জারি করে দেখতে হতো। একবার চিন্তা করে দেখেছেন, এটা মেডিক্যাল জগতে কতোটা পার্থক্য এনে দিয়েছে?

যাই হোক, রঞ্জন রশ্মি কি আমাদের জন্য ক্ষতিকর? হ্যাঁ, এটি আয়োনাইজিং রেডিয়েশনের ক্যাটাগরিতে পড়ে, যেটা আমাদের ত্বকের জন্য ক্ষতিকর। যখন সাধারণ লাইট অ্যাটমের উপর আঘাত হানে, সেটা অ্যাটমে কোন পরিবর্তন আনতে পারে না। কিন্তু যখন এক্সরে অ্যাটমে আঘাত হানে, অ্যাটমের ইলেকট্রনে উত্তেজনার সৃষ্টি করে এবং আয়নের তৈরি করে, যেটা অ্যাটমকে ইলেক্ট্রিক্যালি চার্জ করে ফেলে। আয়নের ইলেকট্রিক্যাল চার্জ কোষের মধ্যে অনাকাঙ্ক্ষিত বিক্রিয়ার সৃষ্টি করে এবং ডিএনএ বন্ধন বিচ্ছিন্ন করতে পারে। কোন কোষের ডিএনএ ভেঙ্গে গেলে বা কোষটি মরে যায় অথবা ডিএনএ পরিবর্তন হয়ে যায়। আর কোষে ডিএনএ পরিবর্তন হয়ে যাওয়া মানে কোষটি ক্যান্সার দ্বারা আক্রান্ত হয়ে যাওয়া। আর এই ক্যান্সার আলাদা কোষে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

যদিও এটি রিস্ক কিন্তু তারপরেও এটি সার্জারি করা থেকে অনেক ভালো অপশন, সাথে বেশিক্ষণ এই রশ্মিতে না থাকলে তেমন একটা সমস্যার সৃষ্টি হবে না।


সত্যি এটা স্বীকার করতেই হয়, এক্সরে অনেক বিশাল একটি আবিস্কার যার অগুনতি প্রয়োজনীয় ব্যবহার রয়েছে। তো আপনি কি কখনো নিজের শরীরের এক্সরে করিয়েছেন? আমার কখনো করানোর প্রয়োজন পরেনি, তাই আপনার এক্সপেরিয়েন্স নিচে কমেন্ট করে আমার/আমাদের সাথে শেয়ার করুন।

আর্টিকেলটি ভালো লেগেছে?

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রবেশ করিয়ে সাবস্ক্রাইব করে রাখুন, যাতে আমি নতুন আর্টিকেল পাবলিশ করার সাথে সাথে আপনি তা ইনবক্সে পেয়ে যান!

টেকহাবস কখনোই আপনার মেইলে স্প্যাম করবে না, এটি একটি প্রতিজ্ঞা!

Comments

  1. এই বন্ধুর কাছে সাইট লিঙ্কটা পেলাম ❤
    পোস্ট গুলো পড়ে মাথা নস্ট হয়ে গেলো 😍
    অসাধারণ ব্লগ 😘

  2. Sotti bhai, Osadharon post hoe6e. Love U bhai….. ❤ ❤ ❤ ❤ ❤ ❤ ❤ ❤ ❤ ❤ ❤ ❤ ❤ ❤ ❤

  3. আপনার আপনার জ্ঞানের পরিধি আরো বাড়িয়ে দিন। আপনি আরো বেশি বেশি করে আমাদের জানাতে সাহায্য করতে পারেন।

  4. পোস্ট অসাধারণ কিন্তু এটা ভেবে আরো অসাধারণ লাগে যে আপনি এতো কিছু জানেন, hacking, security, all kind of secince :D.
    thanks for being you.

    1. ইন্টারনেট থেকেই প্রতিনিয়ত শিখছি এবং আপনাদের আরো সুন্দর করে উপস্থাপনার মাধ্যমে শেখানোর চেষ্টা করে যাচ্ছি 🙂
      ধন্যবাদ 🙂

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *