এনার্জি সেভিং বাল্ব

প্রযুক্তির জটিল টার্মগুলো কি আপনাকে বিভ্রান্ত করছে? কিছুতেই কি আপনার মস্তিষ্কে পাল্লা পড়ছে না? তাহলে বন্ধু, আপনি এবার সঠিক জায়গায় এসেছেন—কেনোনা এখানে আমি প্রযুক্তির সকল জটিল বিষয় গুলো ভাঙ্গিয়ে সহজ পানির মতো উপস্থাপন করার চেষ্টা করি, যাতে সকলে সহজেই সকল টেক টার্ম গুলো বুঝতে পারে।

পনাদের মধ্যে যারা ছোট বেলায় গ্রামের বাড়িতে কাটিয়েছেন, নিশ্চয় হারিকেন আর কেরোসিন বাতিতে তাদের ছোট বেলা কেটেছে। কারো গ্রামের বাড়িতে বিদ্যুৎ থাকলেও তখনকার সময় বলের আকৃতির সাধারণ বৈদ্যুতিক বাল্ব ছিল, যেগুলো লাল্টে ধরনের আলো আর প্রচুর গরম পয়দা করতো। কিন্তু আজকের দিনে রয়েছে অনেক উজ্জ্বল আইডিয়া—এখনকার বৈদ্যুতিক বাতি অত্যন্ত উজ্জ্বল আলো তৈরি করার পাশাপাশি বিদ্যুৎ সাশ্রয় করে এবং পরিবেশকে ভালো রাখতে সাহায্য করে। আজকের এনার্জি সেভিং বাল্ব বা বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী বাতি; আগের সাধারণ বাল্ব থেকে অনেক উজ্জ্বল এবং ঠাণ্ডা আলো প্রদান করে। বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী বাতির প্রধানত দুইটি আলাদা প্রকার রয়েছে, সিএফএল (কম্প্যাক্ট ফ্লোরেসেন্ট ল্যাম্প) বাল্ব এবং এলইডি (লাইট-ইমেটিং-ডায়োড) বাল্ব। চলুন এদের মধ্যের পার্থক্য এবং এরা কিভাবে কাজ করে সকল বিষয় গুলো বিস্তারিত জেনে নেওয়া যাক…

কেন সাধারণ বাল্ব এনার্জি হাঙরি হয়?

বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী বাতি

সাধারণ বৈদ্যুতিক বাল্ব গুলো আলো তৈরি করে, কেনোনা তারা তাপ উৎপন্ন করে। সাধারণ বাল্বের আকার একটি গোলাকার বলের মতো হয়ে থাকে, যেখানে এক বিশেষ ধরনের গ্যাস দ্বারা পরিপূর্ণ করা থাকে। এর ভেতরে অতি সূক্ষ্ম তার থাকে এবং যে অংশটি উত্তপ্ত হয়ে জ্বলে সেটাকে ফিলামেন্ট বলা হয়, যেটা একটি সূক্ষ্ম তার হয়ে থাকে। ফিলামেন্ট প্রচণ্ড উত্তপ্ত হয়ে উঠে, যখন এর মধ্যদিয়ে ইলেক্ট্রিসিটি প্রবাহিত করানো হয়। আর আপনারা অবশ্যই জানেন যে, গরম বা উত্তপ্ত জিনিষ সর্বদা আলো সৃষ্টি করে। উদাহরণ স্বরূপ আপনি আগুণকে ধরতে পারেন, আগুন জ্বালালে আলোর সৃষ্টি হয়, কেনোনা আগুন গরম। তাছাড়া আপনি যদি কখনো কামারের দোকানে যান, তবে অবশ্যই দেখে থাকবেন তারা লোহা উত্তপ্ত করে, আর লোহার রঙ লাল হয়ে যায়, মানে লোহা থেকে লাল রঙের আলোর সৃষ্টি হয়।

লোহাকে ৯৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উত্তপ্ত করলে এটি লাল রঙ ধারন করে, যদি আরো তাপমাত্রা বাড়িয়ে ১১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হয়, তবে হলুদ রঙ ধারন করে এবং ২৫০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় লোহা সাদা রঙ ধারন করে। সাধারণ বাল্বের ফিলামেন্ট সাদা রঙ্গে জ্বলজ্বল করে কেনোনা সেটা অত্যন্ত উত্তপ্ত হয়ে জ্বলতে থাকে। তো আমরা জানলাম, গরম লোহা প্রথমে লাল, পরে হলুদ এবং শেষে সাদা আলোতে জ্বলতে থাকে, কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, কেন উত্তপ্ত বস্তু আলোর সৃষ্টি করে? যখন আপনি লোহাতে গরম করার জন্য তাপ সরবরাহ করবেন, লোহার ভেতরে থাকা অ্যাটম গুলো সেই তাপ শোষণ করতে আরম্ভ করবে। এতে পরমাণুর অভ্যন্তরে ইলেকট্রন গুলো এক্সট্রা এনার্জি পাওয়ার ফলে অনেক আন্দোলিত হয়ে উঠে, ফলে ইলেকট্রন গুলো অনেক অস্থির হয়ে পরে। কিন্তু আবার তাদের আগের অবস্থায় ফিরে আসা প্রয়োজনীয়, আর আগের অবস্থানে ফিরতে ইলেকট্রনকে কিছু এনার্জি ত্যাগ করতে হয়। এই ত্যাগ করা এনার্জির অংশ হচ্ছে ফোটন, যেটা জ্বলতে থাকে। আলো নিয়ে বিস্তারিত আর্টিকেলটি থেকে আপনি জানতে পারবেন, কিভাবে ফোটন এবং লাইট একে অপরের সাথে সম্পর্ক যুক্ত।

এখন আপনি নিশ্চয় বুঝতে পারছেন, এক টুকরা তারকে গরম করে সেখান থেকে আলো উৎপন্ন করা একেবারেই উপযুক্ত নয়। কেনোনা তারটিকে গরম করে তার শেষ পর্যায় পর্যন্ত নিয়ে যেতে অনেক তাপ সৃষ্টি করার প্রয়োজন পরে, আর অনেক তাপ সৃষ্টি করার জন্য প্রয়োজনীয়, অনেক এনার্জি। এই জন্যই দেখবেন, সাধারণ বৈদ্যুতিক বাল্ব গুলো প্রচণ্ড উত্তপ্ত হয়ে থাকে, হাতে ছোঁয়া একেবারেই অসম্ভব হয়।

সিএফএল

এনার্জি সেভিং বাল্ব

সাধারণ বাতি থেকে সিএফএল সম্পূর্ণ আলাদা পদ্ধতিতে কাজ করে, এটি তাপ থেকে আলো উৎপন্ন না করে ফ্লোরেসেন্স নামক এক আলাদা প্রসেস ব্যবহার করে কাজ করে। সাধারণ লাইট বাল্ব ৯০% এনার্জি অপচয় করে আর মাত্র ১০% এনার্জিকে আলোতে পরিনত করে, এখানেই সিএফএলের সবচাইতে বড় সুবিধা। সিএফএলে কোন ফিলামেন্ট থাকে না, আর কিছু উত্তপ্ত করারও প্রয়োজন পড়ে না। এতে থাকে একটি পেছানো কাঁচের টিউব আর টিউবের মধ্যে থাকে আর্গন এবং পারদের বাষ্প মেশানো গ্যাস। টিউবের উপরের দিকে একটি ইলেকট্রনিক সার্কিট লাগানো থাকে, যেটা বিদ্যুৎকে ঠিকঠাক মতো টিউবের মধ্যে পরিচালনা করে। বিদ্যুৎ পাওয়ার ফলে ভেতরের গ্যাস উত্তেজিত হয়ে পড়ে এবং আলট্রাভায়োলেট লাইট (যেটাকে দেখা যায় না) তৈরি করে, এবার আপনি নিশ্চয় খেয়াল করে থাকবেন, পেছানো টিউবের ভেতরদিকে সাদা কিছুর প্রলেপ দেওয়া থাকে, এটি ফ্লোরেসেন্ট প্রলেপ, যেটা আলট্রাভায়োলেট লাইটকে ভিজিবল লাইটে পরিনত করে।

আগের লম্বা ফ্লোরেসেন্ট বাতি গুলোকে হয়তো রাস্তা বা আপনার গ্যারেজে লাগানো রয়েছে। কিন্তু আপনি বিশ্বাস করবেন কিনা জানি না, আজকের মডার্ন কম্প্যাক্ট ফ্লোরেসেন্ট ল্যাম্প আগের লম্বা ফ্লোরেসেন্ট বাতি, একই নীতিতে কাজ করে।

সিএফএলের অসুবিধা

যদিও সিএফএল সাধারণ লাইট বাল্ব থেকে অনেক বেশি এনার্জি সেভিং করতে সক্ষম কিন্তু তারপরেও এর কিছু অসুবিধা রয়েছে। যেমন- সিএফএলও কিন্তু এক সময় কাজ করা বন্ধ করে দেয় বা নষ্ট হয়ে যায়, কিন্তু আপনি জানলেন যে এর পেছানো টিউবের উপরের অংশে ইলেকট্রনিক সার্কিট লাগানো থাকে ফলে এটিকে রিসাইকেল করা অনেক দুষ্কর হয়ে উঠে। আবার এর টিউবের মধ্যে থাকে পারদ, যেটা সম্পূর্ণই বিষ!-তাই সিএফএল বাল্ব নিজে থেকে ভাঙ্গার চেষ্টা করবেন না, কিংবা আপনার বাচ্চাদের খেলতে দেবেন না, এটা স্বাস্থ্য়ের জন্য সামান্য ক্ষতিকারক হতে পারে। সিএফএল এর স্বাস্থ্য ঝুঁকি থাকার কারনে বর্তমানে আরেক প্রকারের এনার্জি সেভিং বাল্ব অনেক জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে; আর এলইডি বাল্ব ব্যবহার না করার কোন কারণই নেই।

এলইডি

এলইডি

সিএফএল এর সবচাইতে বেটার অলটারনেটিভ অপশন হচ্ছে এলইডি ল্যাম্প। এলইডি আরো বেশি বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী, সিএফএল থেকে একটু বেশি লাস্টিং করে, আর পারদের তো কোন প্রশ্নই আসে না। আর এলইডি’র সবচাইতে ভালো কথা হচ্ছে এই বাল্ব অন করার সাথে সাথেই মাক্স ব্রাইট হয়ে যায়, যেখানে সিএফএল গ্যাস গরম করতে কিছুটা সময় নেয়। শুধু ঘরকে আলোকিত করতে নয়, আজকের প্রায় সকল টর্চ লাইট গুলোতেও বিস্তরভাবে এলইডি ব্যবহৃত হচ্ছে। সাথে আপনার স্মার্টফোন ক্যামেরার ফ্ল্যাশেও এলইডি বাল্ব লাগানো রয়েছে। এলইডি সাধারনত ১.৫ ভোল্ট ডিসি (ডাইরেক্ট কারেন্ট) তে চলে। যেহেতু এটি অনেক কম ভোল্টে চলতে পারে, তাই ছোট ব্যাটারি দ্বারাও একে জ্বালানো সম্ভব। কিন্তু আমাদের বাড়ির বিদ্যুৎ এ অনেক বেশি ভোল্ট থাকে, প্রায় ১১০-২৫০ ভোল্ট এবং এটি এসি, যেখানে এলইডি চলার জন্য লাগে ডিসি। তাই সিএফএল’এর মতো এখানেও এলইডি’কে ঠিকঠাক মতো চলানোর জন্য প্রয়োজন সার্কিট।

এলইডি’র একটি সমস্যা হচ্ছে এতে একসাথে অনেক গুলো বাল্ব লাগানো থাকে, আর এই বাল্ব গুলো ফ্ল্যাশ লাইটের মতো মাত্র একটি দিকে অধিক আলো ছুঁড়ে মারে। তাই এই বাল্বে এই ডিফিউজার থাকে, যেটা সামনের দিকের আলোকে ডিফিউজ করে আর চারিদিকে সমানভাবে ছড়াতে সাহায্য করে। একটি হোম এলইডি ল্যাম্পে সাধারণত ১ থেকে ২ জোড়া এলইডি লাগানো থাকে। এলইডি যদিও অনেক কোন এনার্জি ব্যয় করে সাথে সাধারণ বাল্ব থেকে অনেক কম তাপ উৎপন্ন করে, তারপরেও যেহেতু বাল্বটি সম্পূর্ণ বদ্ধ অবস্থায় থাকে, তাই এর ভেতরে জেনারেট হওয়া তাপ একটু কমই বাইরে আসে। আর এই তাপ ভেতরের সার্কিটকে ড্যামেজ করতে পারে, তাই বাল্বে একটি হিট সিঙ্ক লাগানো থাকে, যেটা তাপ শোষণ করে বাল্বকে ঠাণ্ডা রাখতে সাহায্য করে। বাল্বটির মধ্যে থাকা সার্কিটটি একদমই সিধাসাদা হয়, ব্যাস একটি ট্রান্সফরমার লাগানো থাকে, যেটা হাই ভোল্টেজ কারেন্ট কে ডিসিতে পরিনত করে।

শেষ কথা

তো আপনি কি এখনো আপনার বাড়িতে সাধারণ পুরাতন গোলাকার বাল্ব ব্যবহার করেন, যেটা আলোর চাইতে বেশি তাপ আর বিদ্যুৎ খরচ করে? আমি পরামর্শ দেব এক্ষুনি বদলিয়ে ফেলুন, আজকের দিনে এই বাল্ব গুলোকে ব্যবহার করার কোন প্রশ্নই আসে না। তো এনার্জি সেভিং বাল্ব হিসেবে কোনটি পছন্দ করবেন?—এলইডি, নাকি সিএফএল? এলইডি কিন্তু সিএফএল এর তুলনায় একটু বেশি ব্রাইট সাথে আরো কম পাওয়ার কনজিউম করে। আপনার মতামত আমাদের নিতে কমেন্ট করে প্রকাশ করুন।

আর্টিকেলটি ভালো লেগেছে?

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রবেশ করিয়ে সাবস্ক্রাইব করে রাখুন, যাতে আমি নতুন আর্টিকেল পাবলিশ করার সাথে সাথে আপনি তা ইনবক্সে পেয়ে যান!

টেকহাবস কখনোই আপনার মেইলে স্প্যাম করবে না, এটি একটি প্রতিজ্ঞা!

Comments

  1. Bah osadharon!!! 10/10 ghore koto power er alo lagale bhalo hoy??? Computer ache, tahole ki pas theke alo lagate hobe?? LED na CFL lagabo & koto watt??? Amar eye e minus power ache to glass porte hoy…apni ektu suggest korun bhai…. Post er jonno ❤❤❤❤❤❤❤❤❤❤❤❤❤❤❤❤❤❤❤❤❤❤❤❤

  2. নতুন সব পোস্ট পকেটে নিলাম!!! পরে পড়ে ফেলবো। তবে আগাম ধন্যবাদ 🙂

  3. আমাদের বাসায় LED লাইট use করছি গতো মাস থেকে এ মাসে বিল অনেক কম এসেছে 🙂
    লাইটের দাম একটু বেশি হলেও এই গুলা ব্যাবহার করা লাভ আছে অনেক 🙂
    একটা বেপার জানা দরকার ছিলো tubelight তে কি বিদ্যুৎ খরচ হয় ?
    LED থেকে কতো গুন বেশি খরচ হতে পারে ?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *