শাওমি তৈরির গল্প

কোন জ্ঞান অর্জন করে সেটা মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দেয়ার মধ্য দিয়েই সার্থকতা । আমি মোঃ তৌহিদুর রহমান মাহিন । ভালোবাসি প্রযুক্তিকে , আরও ভালোবাসি প্রযুক্তি সম্পর্কে বেশি বেশি জানতে- জানাতে । নিয়মিত মানসম্মত প্রযুক্তি বিষয়ক আর্টিকেল উপহার দেয়ার প্রত্যয়ে কাজ করছি টেকহাবস এর সাথে ।

র্তমান সময়ে স্মার্টফোন – মোবাইল তথা অন্যান্য প্রযুক্তি পন্য সম্পর্কে যারা চর্চা করেন এবং ধারনা রাখেন শাওমি তাদের কাছে অতি পরিচিত একটি নাম। তবুও যারা এখনও জানেন না শাওমি কি? শাওমি হল প্রধানত একটি চাইনিজ স্মার্টফোন ও প্রযুক্তি পন্য তৈরিকারক কোম্পানি। যাকে মানুষ “চায়নার অ্যাপেল” বলেও সম্মোধন করে। বর্তমানে শাওমি হল সারা পৃথিবীতে ৫ম বৃহত্তম স্মার্টফোন তৈরিকারক কোম্পানি। ২০১৫ সালে শাওমি এর পঞ্চম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী তথা শাওমি ফ্যান ফেস্টিভালে আয়োজিত একটি ফ্লাস সেলে তারা মাত্র ২৪ ঘন্টায় ২.১১ মিলিয়ন স্মার্টফোন বিক্রি করে গিনিস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডে স্হান পায়। তার ঠিক আগের বছর ২০১৪ সালটিতে তারা ৬০ মিলিয়ন স্মার্টফোন বিক্রির মাইলফলক অর্জন করে। তারপর থেকে ধীরে ধীরে শাওমির বিক্রি, চাহিদা এবং জনপ্রিয়তা দিনে দিনে বেড়েই চলেছে। তো শাওমি কতটা জনপ্রিয় ও সমাদৃত সে বিষয়ে আমরা কম-বেশি ধারনা পেয়ে গেলাম।

শাওমির রূপকার ও প্রতিষ্ঠাতাঃ

শাওমির এই সফলতার ও তৈরির পেছনে যার অবদান সবচেয়ে বেশি, তিনি হলেন শাওমির রূপকার ও প্রতিষ্ঠাতা ‘লি জুন’। শিয়াংটাও নামক চীনের একটি ইন্ডাসট্রিয়াল শহরে ১৬ ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সালে তার জন্ম। ১৯৮৭ সালে স্কুল পর্যায়ের পড়াশোনা শেষ করার পর তিনি সেখানকার হুয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। তিনি সে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তার কম্পিউটার সাইন্স এর ওপর গ্র্যাজুয়েশন শেষ করেন। তিনি ছাত্রজীবন থেকেই নিজের একটি কোম্পানি তৈরির স্বপ্ন দেখতেন। তার ইচ্ছা ছিল তার কোম্পানিকে তিনি বিশ্বের কাতারে প্রতিষ্ঠিত করবেন এবং নিজের একটি ব্র্যান্ড ভ্যালু তৈরি করবেন।

শাওমির সিইও

যেহেতু ছাত্রজীবনে তার কাছে টাকা বা ইনভেসমেন্ট ছিল না, তাই তখন তিনি তার স্বপ্নও বাস্তবায়ন করতে পারেননি। গ্র্যাজুয়েশন শেষে ১৯৯২ সালে লি জুন একটি সফটওয়্যার কোম্পানিতে  ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে যোগদান করেন, এটি ছিল বর্তমান সময়ের অন্যতম খ্যাত একটি কোম্পানি”কিং সফট” । তার সফলতার যাত্রা শুরু হয় এই “কিং সফট” এ যোগদান এর মধ্য দিয়েই। মাত্র কয়েকবছরের মধ্যে তিনি তার মেধা এবং কর্মদক্ষতার মাধ্যমে “কিং সফট” এর সিইও বনে যান। তো নিঃসন্দেহে ধারনা করা যায় একজন ব্যাক্তি যে কোনো কোম্পানিতে একটি ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে যোগদান করে এবং পরে সে কোম্পানির সিইও পদে উন্নীত হয়, তার ভেতর কীরকম উদ্দ্যোম/জোশ আছে! তারপর “কিং সফট” এর উন্নয়নে লি জুন ব্যাপক ভাবে কাজ করেন। কিং সফট এর অধীনে তিনি জোইয়ো ডট কম নামক একটি অনলাইন বুক স্টোর প্রতিষ্ঠিত করেন ; যা পরবর্তীতে অ্যামাজন অনেক দামে(প্রায় ৭৪ মিলিয়ন ডলার) কিনে নেয়। এভাবে শুরু থেকে প্রায় ১৬-১৭ বছর” কিং সফটে “কাজ করার পর এবং” কিং সফট”কে একটি ভালো পর্যায়ে পৌছিয়ে দেয়ার পর লি “কিং সফট” ছেড়ে দেন।

শাওমির জন্মঃ

তারপর কয়েকবছর তিনি তার পরিবারকে সময় দেন সাথে ইউসি ওয়েব সহ আরও চাইনিজ নামিদামি কোম্পানির সাথে কাজ করেন। এমন অবস্হায় তার ছাত্রজীবনের যে ইচ্ছাটি ছিল যে, তার নিজের একটি কোম্পানি খুলবেন এবং তা প্রতিষ্ঠিত করবেন, সে ইচ্ছাটি আবার জেগে ওঠে। তারপর তিনি তার কতগুলো বন্ধুদের নিয়ে ২০১০ সালের এপ্রিলে একটি কোম্পানি চালু করেন এবং এর নাম দেন “শাওমি”।

তবে শাওমি চালু করার জন্য তাদের ইনভেস্টর দরকার ছিলো। পরবর্তীতে হংকং এর এক বিলিয়নিয়ার এবং হংকং এর বৃহত হ্যাং ল্যাং প্রোপার্টিজ এর মালিক ‘শ্যান’ শাওমিতে বিনিয়োগ এর ইচ্ছা প্রকাশ করে এবং বিনিয়োগ করেন।

শাওমি প্রান পায় ।শাওমি কোম্পানি গঠন করার পর এটি কোনরকম স্মার্টফোন বা গ্যাজেটস তথা হার্ডওয়্যার উৎপাদন করত না। শাওমি প্রথম প্রথম একটি সফটওয়্যার কোম্পানি ছিল। যারা ইউআই বা ইউজার ইন্টারফেস তৈরি করত।শাওমি শুরুর দিকে গুগলের এন্ড্রয়েড অপারেটিং সিস্টেম এর ওপর ভিত্তি করে ইউআই বা ইউজার ইন্টারফেস  তৈরি করত। তখন তারা চেষ্টা করতেন সহজ-সরল ব্যবহারযোগ্য ইন্টারফেস দেবার এবং এমন অনেক সুবিধা দেবার, যা এন্ড্রয়েডে ডিফল্টভাবে থাকত না। এভাবে চলার পর শাওমি লঞ্চ করে তাদের প্রথম এন্ড্রয়েড ভিত্তিক ফার্মওয়্যার বা কাস্টম রম MIUI। তারা এই এই ফার্মওয়্যারকে বিভিন্ন চিপসেট এবং ২০০ টির বেশী স্মার্টফোনের উপযোগী করে তুলেছিল।এভাবে তাদের এই MIUI আরেকটি জনপ্রিয় কাস্টম রম Cynogenmod এর থেকেও বেশী জনপ্রিয়তা পায়।

শাওমি মি এমআই

২০১১ সালে শাওমি তৈরি করে তাদের প্রথম স্মার্টফোন MI 1। এটি তারা কেবল চীনে লঞ্চ করে। এটা ছিল সাশ্রয়ী দামে একটি টপ স্পেসিফিকেশন স্মার্টফোন। চীনে ডিভাইসটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। এই থেকে শাওমির মূলমন্ত্র এর সূচনা ঘটে, তা হল ” সেরা হার্ডওয়্যার একটি সাশ্রয়ী দামে”। তারপর তারা আনে তাদের দ্বিতীয় স্মার্টফোন যার নাম ছিল MI 2।স্মার্টফোনটিতে ছিল স্ন্যাপড্রাগন এস৪ প্রো চিপসেট ; যেটা ছিল সে সময়কার অন্যতম সেরা স্মার্টফোন চিপসেট। এই স্মার্টফোনটি তার আগেরটার থেকে আরও ব্যাপক সাফল্য পায়।মানুষ তখন থেকে শাওমিকে “চায়নার অ্যাপেল” বলতে শুরু করে।সে বছর কোম্পানিটি ‘হুগো বারা’ নামে একজনকে নিয়োগ করে, যে  ছিলো একজন এক্স-গুগল কর্মচারী। তিনি শাওমিকে পশ্চিমা বিশ্বে পরিচিত করে তোলার কাজটি করেন। শাওমি ততদিন কেবল চীনে জনপ্রিয় ছিলো, তবে হুগো বারা একে বাইরের উন্নত বিশ্বে দিনে দিনে জনপ্রিয় করে তোলার কাজটি করেন। ২০১৩ সালে কোম্পানিটি তার নেতৃত্বে পশ্চিমা বিশ্বে তাদের তৈরি এই স্মার্টফোনগুলো বাজার তৈরি করার কাজ শুরু করে। একই বছর শাওমি চীনে তাদের প্রথম স্মার্টটিভি লঞ্চ করে, পাশাপাশি লঞ্চ করে স্মার্টফোন পরিবারের নতুন সদস্য MI 3।

এশিয়ার বাজারে শাওমি

জুলাই, ২০১৪। শাওমি ফ্লিপকার্ট এর মাধ্যমে ভারতের বাজারে প্রবেশ করে। যেটা ছিল চীনের পরে তাদের সবচাইতে বড় একটি বাজার। শাওমি ভারতের বাজারে তাদের MI 3 স্মার্টফোন ছাড়ে,মানুষ একে কেবল ফ্লিপকার্ট এর মাধ্যমে কিনতে পারত। শাওমি এতে তাদের নতুন এই বাজারটিতে দারুন রেসপন্স পায়। ফ্লিপকার্ট এর একটি ফ্লাস সেলে তারা মাত্র ৪.২ সেকেন্ডে ১ লক্ষ স্মার্টফোনের অর্ডার পায়। এভাবে ভারতে প্রবেশ এর মধ্য দিয়ে শাওমি দক্ষিন এশিয়ায় ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। ২০১৭ সালের শুরু থেকে বাংলাদেশের মানুষের ভেতর শাওমির প্রতি প্রবল আগ্রহ দারুনভাবে লক্ষ্যনীয়।শাওমি যুক্তরাষ্ট্র,চীন,ভারত,হংকং,তাইওয়ান,সিংগাপুর,মালয়শিয়া,ফিলিপাইন,ইন্দোনেশিয়ায় অফিসিয়ালি তাদের কার্যক্রম চালাচ্ছে। এমন অনেক দেশ রয়েছে যেখানে শাওমি এখনও পৌছায়ই নি । বাংলাদেশে শাওমির হয়ে অফিসিয়ালি স্মার্টফোন বিক্রির কাজ করছে সোলার ইলেকট্রো বাংলাদেশ।


বর্তমানে শাওমি তাদের হার্ডওয়্যার এবং সফটওয়্যার প্রযুক্তি দিনে দিনে উন্নত করে যাচ্ছে। একটি ব্যবহার বান্ধব সহজ সরল ডিভাইস তৈরী করা শাওমির মূল নীতি। সম্প্রতি তারা তাদের নিজস্ব স্মার্টফোন চিপসেট Surge নিয়ে কাজ করছে। ইতিমধ্যে তারা তাদের MI5C স্মার্টফোনটিতে এই Surge S1 প্রোসেসর ব্যবহার করেছে।

বর্তমানে শাওমি স্মার্টফোন ছাড়াও আরও স্মার্ট ডিভাইস উৎপাদন করছে। ২০১৬ সালে লঞ্চ হওয়া তাদের MI Notebook Air বিশ্ববাজারে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে এবং একে Apple Macbook এর সাথে তুলনা করা হচ্ছে। শাওমি এছাড়াও হেডফোন, পাওয়াব্যাংকস,স্মার্টঘড়ি,ভিআর বক্স উৎপাদন করছে। তাদের সৃজনশীল কতগুলো প্রোডাক্টস হচ্ছে শাওমি এয়ার পিউরিফায়ার, শাওমি নাইনবোট রোবট,শাওমি ওয়াটার পিউরিফায়ার,শাওমি ড্রোন,শাওমি টিভি এবং টিভি বক্স। এসবের বেশিরভাগই কেবল চায়নার বাজারে পাওয়া যায়।

আমাকে পেতে পারেন ফেসবুকে


তথ্যসূত্রঃ Forbes,NDTV Gadgets,Startup Stories
ইমেজ ক্রেডিট; By testing Via Shutterstock | By zhangjin_net Via Shutterstock | By Hermiadi Eher Via Shutterstock

আর্টিকেলটি ভালো লেগেছে?

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রবেশ করিয়ে সাবস্ক্রাইব করে রাখুন, যাতে আমি নতুন আর্টিকেল পাবলিশ করার সাথে সাথে আপনি তা ইনবক্সে পেয়ে যান!

টেকহাবস কখনোই আপনার মেইলে স্প্যাম করবে না, এটি একটি প্রতিজ্ঞা!

Comments

    1. আমাদের সাথেই থাকুন!! আমরা আরও মানসম্মত আর্টিকেল উপহার দিব ইনসাআল্লাহ 😊

    1. আপনাকে ধন্যবাদ। আমাদের সাথেই থাকুন 💘

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *