ই প্রথম স্যামসাং এবং অ্যাপেল এর  মত বৃহত স্মার্টফোন ম্যানুফ্যাকচারাস দের রেকর্ড ভাঙার কাজটি করেছিল একটি সদ্য প্রতিষ্ঠিত কোম্পানি। এমনকি তাদের তৈরি স্মার্টফোনটিকে “ফ্লাগশীপ কিলার” এর খেতাব দেয়া হয়েছিল। কেননা নতুন এই কোম্পানিটির এই স্মার্টফোন লঞ্চ হওয়ার পর থেকেই বড় বড় সব কোন্পানির স্মার্টফোনের বিরুদ্ধে প্রতিযোগিতায় ছিলো এগিয়ে! আর হ্যা যে কোম্পানিটি তথা আমাদের জনপ্রিয় যে ব্র্যান্ডটি মোবাইল /স্মার্টফোন ইন্ডাস্ট্রীতে এই রেভুলিউশন এনেছে, তার নাম হল ওয়ানপ্লাস। আজ আমরা কথা বলব ফ্লাগশীপ কিলার নির্মাতা তথা ওয়ানপ্লাস ব্র্যান্ডটি নিয়ে। বিগত একটি আর্টিকেলে আমরা শাওমি এর তৈরির গল্প নিয়ে লিখেছি, আজ আমরা আপনাদের জানাব কিভাবে ওয়ানপ্লাস এর সৃষ্টি।

স্টার্টআপ থেকে ওয়ানপ্লাসঃ

ওয়ানপ্লাস একটি চাইনিজ স্টার্টআপ।২০১৩ সালে চীনে একে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছিল। অনেকের ”প্রানের চেয়ে প্রিয়” এই স্মার্টফোন কোম্পানিটির নেপথ্যে রয়েছেন, এদের প্রতিষ্ঠাতা পিট লাউ (Pete Lau) এবং কার্ল পেই (Carl Pei)। পিট লাউ ওয়ানপ্লাস কোম্পানির সিইও। তিনি তার কর্মজীবন শুরু করেন ওপো ইলেকট্রনিক্সে একজন হার্ডওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে। যদিও তিনি ওপোতে হার্ডওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজ শুরু করেছিলেন, তবে জলদি তিনি ওপোর ব্লু-রে ডিভিশন এর ডাইরেক্টর হিসেবে নিযুক্ত হন। তারপর তিনি আরেক দফা প্রোমোশন পেয়ে ওপোর হেড ওফ মার্কেটিং পদে নিযুক্ত হন। হমম তার উন্নতি থেমে থাকেনি সর্বশেষ তিনি ওপোর ভাইস প্রেসিডেন্ট পদে উন্নিত হন। ওপো এন১ স্মার্টফোনে ”সাইনোজেন মোড” এর ব্যবহারের পেছনে তার অনেক বড় অবদান ছিলো।

শাওমির শুরু থেকে আজকের গল্প!

ইন্ডাস্ট্রীতে নানাভাবে নানা জায়গায় অনেক খারাপ দিক বা কমতি রয়েছে। এদের ভেতর একটি হল প্রিমিয়াম স্মার্টফোনের অতিরিক্ত দাম। তাদের অনেক আগে থেকেই স্বপ্ন ছিলো নিজেদের স্মার্টফোন কোম্পানি তৈরি করবেন। অবশেষে পিট সাময়িকভাবে ২০১৩ সালে ওপো ইলেকট্রনিক্স ছেড়ে দেন। পিট ও কার্ল মিলে শুরু করেন তাদের স্টার্টআপ জার্নি। ওইসময় ওয়ানপ্লাস নামক নতুন এই স্টার্টআপে মাত্র ৫ জন কর্মচারি ছিল। ঠিক অন্যসকল স্টার্টআপ এর মতই কজন মিলে তারা রেস্টুরেন্টে বসে থেকে, স্মার্টফোন এবং তাদের স্মার্টফোন ব্যবহারের নানা এক্সপেরিয়েন্স নিয়ে আলোচনা করতেন। যদিও তারা সবাই এন্ড্রয়েড নিয়ে কাজ করতে যাচ্ছিলেন, তবুও তারা ছিলেন আইফোন ইউজার। তারা যখন এন্ড্রয়েড না ব্যবহার করার কারনগুলো নিয়ে আলোচনা শুরু করলেন, তখন কারনগুলো ছিল অনেক। যেমনঃ খারাপ কোয়ালিটি, খারাপ সফটওয়্যার এবং অসাঞ্জস্যপূর্ন হার্ডওয়্যার। আর এ থেকেই তারা পণ করলেন এমন একটি স্মার্টফোন বানাবেন ; যেখানে ভালো বিল্ড কোয়ালিটি থাকবে, সবার নজরে আসে এমন স্পেসিফিকেশন থাকবে এবং ভালো ডিজাইন থাকবে- তবে ফোনের দাম কত হবে সে বিষয়ে তারা তখনও আলোচনা করেননি। অন্যদিকে বলতে গেলে তখনকার সময় এন্ড্রয়েডের হিসেবে এরকম ভালো মানের ডিভাইস ছিলনা। ওয়ানপ্লাস এর এই তরুন উদ্যোক্তাদের কেবল একটি ইচ্ছা ছিল, তারা দারুন একটি এন্ড্রয়েড ডিভাইস বানাবেন, যাতে ” মানুষ কি জন্য এন্ড্রয়েড ব্যবহার করে না ” এসব নেতিবাচক দিকগুলো থাকবে না।পরবর্তীতে তারা তাদের কোম্পানিটির এনাউন্সমেন্ট করে  এবং প্রথম এন্ড্রয়েড স্মার্টফোন ”ওয়ানপ্লাস ওয়ান” এর কাজ শুরু করল। তারপর যখন তারা প্রোটোটাইপ তৈরি করে, তখন তারা আবিষ্কার করলেন যে,সাশ্রয়ী মূল্যেই তারা একটি ”ফ্লাগশীপ কিলার” বানাতে পারবেন। এভাবে তাদের যাত্রা শুরু হল!

তারা জানতেন এন্ড্রয়েড অপারেটিং সিস্টেমের কাছে একটি বড় মার্কেট শেয়ার রয়েছে, তবে বেশিরভাগ মানুষ অ্যাপেল এর দিকে বেশি আগ্রহী,কেননা অ্যাপেলই একমাত্র কোম্পানি যারা তাদের পন্যের সব দিক দিয়ে খেয়াল রাখত। তারা ভাবতেন তৎকালীন এন্ড্রয়েড স্মার্টফোন নির্মাতারা তাদের ফোনে ফিচার কেবল এইজন্য দিতেন যে,তাদের স্মার্টফোন যেনো অন্য স্মার্টফোন থেকে আলাদা হয়, তবে তারা ব্যবহারকারীর মনের কথা সম্পর্কে ভাবতেন না- যে তারা আসলে কি চায় ।

একটি সাশ্রয়ী দামের ফ্লাগসীপ কিলার তৈরির ইচ্ছা থেকে তারা বাজারে ওয়ানপ্লাস ওয়ান লঞ্চ এর জন্য প্রস্তুত ছিলেন,তবে তারা প্রচলিত উপায়ে স্মার্টফোন বাজারে ছাড়ার জন্য আগ্রহী ছিলেন না। তারা ইনভাইট অনলি সিস্টেম এর মত একটি প্রথা ব্যবহার করে, তাদের প্রথম স্মার্টফোন লঞ্চ করার সিদ্ধান্ত নেয়। ওয়ানপ্লাস এই সিস্টেমকে ব্যবহার করে তাদের প্রথম লঞ্চিং করে। ওইসময়কার ইন্ডাস্ট্রিএক্সপার্টদের দাবী ছিল, এরকম সিস্টেম কাজ করবে না, তবে সবাইকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ওয়ানপ্লাস ইনভাইট অনলি সিস্টেম ব্যবহার করেই, এমন একটি ব্র্যান্ডকে ভাইরাল করে -যে ব্র্যান্ড এর নাম সম্পর্কে তখনও কেউ জানত না।

সাফল্যঃ

ওয়ানপ্লাস

২০১৪ সালে ওয়ানপ্লাস ওয়ান হয়ে উঠল সবচাইতে পছন্দনীয় স্মার্টফোন এবং বছরটির শেষ পর্যন্ত প্রায় ১.৫ মিলিয়ন পিস ওয়ানপ্লাস ওয়ান বিশ্বব্যাপি বিক্রি হয়। আর সবচেয়ে বড় কথা ছিল এটি যে,এইসব অর্জিত হয়েছিল কোনরকম এডভার্টাইজিং ছাড়াই।

দক্ষিন এশিয়ার দেশ গুলোর ভেতর ভারত হল ওয়ানপ্লাস এর অন্যতম বড় মার্কেট। তবে ভারতে ”ওয়ানপ্লাস ওয়ান” এর ”সাইনোজেন মোড” নিয়ে মাইক্রোম্যাক্স এর সাথে আইনি জটিলতার কারনে ; তাদের পরবর্তী ”ওয়ানপ্লাস টু” স্মার্টফোনে নিজস্ব কাস্টম রম অক্সিজেন ওএস ব্যবহার শুরু করে। তারপর ধীরে ধীরে সফলতার পর ওয়ানপ্লাস তাদের স্মার্টফোন সাউথ-ইস্ট এশিয়ায় নিয়ে যায়। আর এজন্য তারা লাজাডা ইন্দোনেশিয়া নামক অনলাইন রিটেইল এর সাথে চুক্তি করে।

বিশ্বব্যাপী তাদের ওয়ানপ্লাস টু ছড়িয়ে পরার পর বিশ্বব্যাপী টেক রিভিউয়ার এবং ওয়েবসাইটগুলো একে আবারও ব্যাপকভাবে ”ফ্লাগশীপ কিলার” এর খেতাব দেয়। এভাবে কোম্পানিটি ধীরে ধীরে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পরতে শুরু করে । ওয়ানপ্লাস ৩ বের হওয়ার পর তারা এত অর্ডার পান যে, তাদের বিক্রি ততদিন পর্যন্ত বন্ধ রাখতে হয়, যতদিন না পর্যন্ত তারা সবার চাহিদা মেটাতে পারেন। তাদের ওয়ানপ্লাস ৩টি এন্ড্রয়েড স্মার্টফোনগুলোর ভেতর একটি লিজেন্ড তা বলতেই হবে।

ওয়ানপ্লাস এর বীজমন্ত্রঃ

আসলে একটি কোম্পানি যারা এত কম সময়ে বড় বড় কোম্পানির উপরে চলে আসল এটি কিভাবে সম্ভব? আসলে এর পেছনে রয়েছে তাদের মূল মন্ত্র।তারা স্মার্টফোনকে সরাসরি ম্যানুফ্যাকচারার থেকে কাস্টমার এর কাছে পাঠানোতে বিশ্বাসী ছিল, ভিতর থেকে অন্যান্য ব্যবসায়ী বা ডিলারদের সরিয়ে। তারা কাস্টমারদের ভালো জিনিস দিতে বেশি বিশ্বাসী-মার্কেটিং এ নয়।মার্কেটিং এর পর্দা দিয়ে ফোনের খারাপ দিক ঢাকা সম্ভব নয়। তাদের দাবী একজন স্যাটিসফাইড কাস্টমারই কোম্পানিকে অনেকদুর নিয়ে যেতে সক্ষম।

ওয়ানপ্লাস এর আরেকটি সাক্সেসর ছিল তাদের ওয়ানপ্লাস ৫ ফ্লাগশীপ ডিভাইসটি। আমাদের দেশে এখনও অনেক মানুষ এই ওয়ানপ্লাস ৫ কিনছে। ৫.৫ ইঞ্চি এর স্ন্যাপড্রাগন ৮৩৫ চিপসেট ও ৬ জিবি / ৮ জিবি ডিডআর ৪ র্যাম সম্পন্ন তাদের এই সাক্সেসর ফ্লাগশীপটি বিশ্বব্যাপী ব্যাপকভাবপ জনপ্রিয়তা পায়। অ্যামাজন ইন্ডিয়ায় সবচেয়ে বেশি রেভেনিউ আয় করা স্মার্টফোন হল ওয়ানপ্লাস ৫। আগামী বছরে ওয়ানপ্লাস এর পরবর্তী ফ্লাগশীপ ওয়ানপ্লাস ৬ বিড বাজেট এই ডিভাইসটি হয়ত আরো নতুন কিছু নিয়ে আসবে।


সোর্সঃ স্টার্টআপ স্টোরিস

ইমেজ ক্রেডিট; By Joe Ravi Via Shutterstock | By Esa Riutta Via Shutterstock

Posted by তৌহিদুর রহমান মাহিন

কোন জ্ঞান অর্জন করে সেটা মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দেয়ার মধ্য দিয়েই সার্থকতা । আমি মোঃ তৌহিদুর রহমান মাহিন । ভালোবাসি প্রযুক্তিকে , আরও ভালোবাসি প্রযুক্তি সম্পর্কে বেশি বেশি জানতে- জানাতে । নিয়মিত মানসম্মত প্রযুক্তি বিষয়ক আর্টিকেল উপহার দেয়ার প্রত্যয়ে কাজ করছি টেকহাবস এর সাথে ।

21 Comments

  1. তৌহিদুর রহমান মাহিন ভাইয়া খুবই ভালো লেগেছে আর্টিকেলটি। ধন্যবাদ ভাইয়া আমাদের এত সুন্দর পোষ্ট উপহার দেয়ার জন্য,,,।

    Reply

    1. তৌহিদুর রহমান মাহিনOctober 25, 2017 at 1:55 pm

      আপনাকেও ধন্যবাদ।

      Reply

  2. Smartphone company history niye lekhar serious gun ace dekhi apnar. really adictive series.. love this touhidur bhai.

    Reply

    1. তৌহিদুর রহমান মাহিনOctober 25, 2017 at 1:56 pm

      সাথেই থাকুন 🙂

      Reply

  3. Acca vaia apni ki bolte parben je tara kno 1+ 4 skip korlo…??

    Reply

    1. তৌহিদুর রহমান মাহিনOctober 25, 2017 at 3:45 pm

      ইস্ট এশিয়ান কান্ট্রি, যেমন চায়নায় একটা একটি ফোবিয়া আছে এটি হল টেট্রাফোবিয়া। এর ফলে তারা ৪ সংখ্যাটিকে ভয় করে। তাদের কাছে ৪ সংখ্যাটি অকল্যানজনক। আর সে জন্যই ওয়ানপ্লাস ৪ আসেনি, এসেছে ওয়ানপ্লাস ৩টি। আবার শাওমি এই কারনেই চায়নায় উৎপাদন করা রেডমি ও রেডমি নোট সিরিজের সর্বশেষ ফোন এর নাম ৪ না দিয়ে ৪এক্স দিয়েছে। (তবে ভারতে যেগুলো উৎপাদন করা হয়েছে সেগুলোর নাম রেডমি ৪ বা রেডমি নোট ৪ ই ছিল -এটি কেবল ভারতে নিয়ন্ত্রিত ভারতের বাজারে জন্য।) সুতরাং শাওমিও এখানে ৪ সংখ্যাটির সাথে Suffix ব্যবহার করেছে। আশা করি উত্তরটি পেয়েছেন।

      Reply

  4. Awesome post. Next time Samsung niye plzzz.

    Reply

    1. তৌহিদুর রহমান মাহিনOctober 25, 2017 at 8:24 pm

      ইনসাআল্লাহ

      Reply

  5. Xooss content bro…

    Reply

    1. তৌহিদুর রহমান মাহিনOctober 25, 2017 at 9:40 pm

      💘

      Reply

  6. আমার সবচেয়ে প্রিয় Brand নিয়ে লেখার জন্ন ধন্নবাদ🙆

    Reply

    1. তৌহিদুর রহমান মাহিনOctober 25, 2017 at 9:39 pm

      🙂

      Reply

  7. Touhid vai apni techubs e kibabee likhcen? Amra kivabe likhbo?

    Reply

    1. তৌহিদুর রহমান মাহিনOctober 25, 2017 at 10:51 pm

      টেকহাবসকে আরও বিস্তৃত এবং সমাদৃত করার লক্ষ্যে তাহমিদ বোরহান ভাই এর নেতৃত্বে টিম গঠন করা হয়েছে। আমি সেই টিম এর একজন সক্রিয় সদস্য

      Reply

  8. Good post. Bhaiya ami autocad sekhar jonno pc build korte cai. Kmn config lagbe jodi ektu help korten.

    Reply

    1. তৌহিদুর রহমান মাহিনOctober 26, 2017 at 8:21 am

      তুলনামূলক ভালো পারর্ফমেন্স পাওয়ার জন্যঃ

      কোর আই ৩ প্রোসেসর

      ৪ জিবি Ram

      উইন্ডোজ ৭ বা উইন্ডোজ ১০

      ডাইরেক্ট এক্স ৯ / ডাইরেক্ট এক্স ১১ সাপোর্টেড মিনিমাম ২ জিবি গ্রাফিক্স কার্ড

      Reply

      1. AutoCAD r jonno i5 valo na?

        Reply

        1. RAM 8GB best hobe.

          Reply

          1. আমি মিনিমাম স্পেসিফিকেশন উল্লেখ করেছি। এর যত বেশি লাগাতে পারবেন তত ভালো!

  9. সুন্দর একটা পোস্টের জন্য ধন্যবাদ 🙂

    Reply

  10. nice article. enjoyed! plx do keep this series.

    Reply

Leave a reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *