ওয়ালটন প্রিমো এস৬ (Primo S6) হ্যান্ডস অন রিভিউ | বাজেট কিলার?

বর্তমান সময়ে প্রযুক্তির ব্যাপক অগ্রগতির কারনে, যে ডিভাইসটি এখন আমাদের সবার হাতে হাতে তা হল একটি স্মার্টফোন। স্মার্টফোন প্রযুক্তির ব্যবহারে ও প্রয়োগের ক্ষেত্রে সৃষ্টি করেছে নতুন মাত্রা। আর এ কারনে আমাদের অনেক বড় একটি মাথা-ব্যাথা থাকে এই দারুন ও প্রয়োজনীয় ডিভাইস স্মার্টফোন বাছাই করা নিয়ে। আর আপনাদের স্মার্টফোন বাছাই এর দ্বিধা-দ্বন্দ মেটাতে টেকহাবসে নানাসময় বিভিন্ন স্মার্টফোন নিয়ে লেখা হয়ে থাকে। তারই ধারাবাহিকতায় আজ আমরা দেশীয় ব্র্যান্ড ওয়ালটনের একটি ১৫ হাজার-বাজেট এর দারুন স্মার্টফোন ওয়ালটন প্রিমো এস৬ সম্পর্কে জানব তথা পড়ব এর সম্পূর্ণ হ্যান্ডস অন রিভিউ।

একনজরে প্রিমো এস৬

  • ৫.২ ইঞ্চি আইপিএস অন-স্ক্রীন এলসিডি ডিসপ্লে।
  • ৩ জিবি Ram, ১৬ জিবি ইন্টারনাল স্টোরেজ/ রম।
  • এন্ড্রয়েড ৭.০ নগাট ভার্সন।
  • Cortex A53 কোয়াড কোর সিপিইউ,Mali T720 গ্রাফিক্স প্রোসেসিং ইউনিট।
  • ৪০০০ এমএএইচ লিথিয়াম পলিমার ব্যাটারি।
  • ১৩ মেগাপিক্সেল প্রাইমারি ও ১৬ মেগাপিক্সেল সেকেন্ডারি ক্যামেরা।
  • দামঃ ১৫৬০০ টাকা।

ডিসপ্লে

স্মার্টফোনটিতে ডিসপ্লে ইউনিট হিসেবে থাকছে ৫.২ ইঞ্চি অন-সেল এইচডি ডিসপ্লে। অন-সেল ডিসপ্লে একটি নতুন ডিসপ্লে টেকনোলজি। যেখানে অন্যান্য এলসিডি ডিসপ্লে এর সাথে টাচ প্যানেল থাকে, সাথে থাকে একটি টাচ কন্ট্রোলার – অন্যদিকে অন-সেল ডিসপ্লে টেকনোলোজিতে থাকে সিম্পল একটি টাচ প্যানেল সেন্সর।স্মার্টফোনের ক্ষেত্রে অন-সেল ডিসপ্লে অধিক কার্যকর এবং সুবিধাপূর্ন হয়,কেননা এটি তুলনামূলক পাতলা হয় সচরাচর প্রচলিত এলসিডি ইউনিট এর থেকে।

২.৫ডি কার্ভড ডিসপ্লে হওয়ার কারনে স্মার্টফোন চালিয়েও আলাদা মজা পাওয়া যাবে। তবে ২.৫ডি কার্ভড ডিসপ্লে এর একমাত্র ও সচরাচর যে সমস্যা সেটি হল সাধারন গ্লাস প্রোটেকটর বা টেমপারড গ্লাস লাগালে সাইড দিয়ে ফাকা হয়ে থাকে,অনেক ব্যবহারকারীর কাছে তা একদম বিরক্ত লাগে। ওয়ালটন দাবী করছে ২.৫ডি কার্ভড ডিসপ্লেতে প্রোটেকশন এর জন্য স্ক্র্যাচ প্রুফ গ্লাস ব্যবহার করা হয়েছে। তাই তুলনামূলক সাধারন ঘষা-মাজায় সমস্যা না হলেও – একটু উচু থেকে পড়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে রিস্ক থাকেই। এইজন্য থার্ড পার্টি ব্যাক কভার ব্যবহার করবেন নিঃসন্দেহে।

এটি একটি ১৬মিলিয়ন কালার সাপোর্টেড ডিসপ্লে। ডিসপ্লে রেজুলেশন ১২৮০*৭২০ হওয়ার কারনে, তুলনামূলক ভালো মানের এইচডি ভিডিও বা ৭২০পি এইচডি ভিডিও ভালোভাবেই উপভোগ করা যাবে। আর IPS টেকনোলোজি LCD ডিসপ্লে হওয়ার কারনে ভিউইং অ্যাঙ্গেল নিয়ে কোন সমস্যা হওয়ারও কথা না। তবে আমার মতে রেজুলেশন ১৯২০*১০৮০ (ফুল এইচডি) ফলে বেশি ভালো হতো, অন্তত এই বাজেটের ফোনে ফুল এইচডি রেজুলেশন হওয়া উচিৎ ছিল।

ইউজার ইন্টারফেস ও অন্যান্য

ডিভাইসটির ইউজার ইন্টারফেসটিকে স্টক থেকে পুরোপুরি বদলে ফেলা হয়েছে জিওনির amigo os 4.0 দিয়ে। এখানে স্টক এন্ড্রয়েড এর কোন কিছুই তেমন দেখা যাবে না। যারা স্টক বাদ দিয়ে কাস্টম ইন্টারফেস এর লাভার তাদের জন্য এই অ্যামিগো ইউআই পছন্দের হতে পারে। যেহেতু ডিভাইসটিতে একটি আইআর ব্লাস্টার রয়েছে, সেহেতু এটি দিয়ে ব্যবহারকারীগন বিভিন্ন ইলেকট্রনিক্স যন্ত্রাংশ তথা টিভি, এয়ার কন্ডিশনার নিয়ন্ত্রন করতে পারবে।

অ্যামিগো ওএস সমৃদ্ধ এই ফোনে বিল্টইন ভাবে মেমোরী ক্লিনার, ব্যাটারি অপটিমাইজার, অ্যাপস ম্যানেজার, ভাইরাস ডিটেকটর এর মত ফিচার রয়েছে; যা স্টক এন্ড্রয়েডে থাকে না। ব্যবহারকারী চাইলে ফোনটিতে থাকা থীম ম্যানেজার থেকে বিভিন্ন থীমসও ব্যাবহার করতে পারবে। ফোনটির সেটিংস অ্যাপ থেকে ফোন নিয়ন্ত্রন এর জন্য অনেক অপশন পাবেন। শাওমির এমআইইউআই (MIUI) এর মত অ্যামিগো ওএসে একটি কুইক বল ফিচারও রয়েছে।

যেহেতু ডিভাইসটি এন্ড্রয়েড ৭ এ অপারেট হচ্ছে তাই স্প্লিট স্ক্রীন সুবিধা তথা একসাথে দুটি অ্যাপ্লিকেশন ব্যবহার করা যাবে। পিছে ফিংগারপ্রিন্ট সেন্সর থাকার কারনে সিকিউরিটির ক্ষেত্রে বরাবরের মত আপনার হাতের অাঙুলের ছাপ ব্যবহার করতে পারবেন। ডিভাইসটি ৫ ফিংগার মাল্টিটাচ সাপোর্টেড এবং এর বেঞ্চমার্ক স্কোর এসেছে ৩৮১৬৮। আর নিনামার্কে স্কোর এসেছে ৬২.১ fps।

বডি ও ডাইমেনসন

ডিভাইসটি ১৫০.৪ মিলিমিটার লম্বা এবং প্রস্হে ৭৩.৫ মিলিমিটার প্রসস্থ।ইনবিল্ট ব্যাটারিসহ এর ওজন হল ১৬৬ গ্রাম(প্রায়)।ডিভাইসটির(কত মোটা) পুরুত্ব হল ৮.৮ মিলিমিটার। ওয়ালটন এই স্মার্টফোনটি দুটি কালার তথা গোল্ড ও ব্লাক কালারে বাজারে ছেড়েছে। ডিভাইসটতে একটি নোটিফিকেশন লাইট রয়েছে।

হার্ডওয়্যার ও চিপসেট

ফোনটিতে চিপসেট হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে Advance Risk Machine তথা ARM এর Cortex A53 প্রোসেসর। ARM হল একটি চিপসেট ডিজাইনিং কোম্পানি,যারা বহু আগে থেকে স্মার্টফোন সহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি যন্ত্রের চিপস ডিজাইন করে আসছে,ARM প্রোসেসর চিপ ডিজাইন ও উৎপাদনের পাশাপাশি গ্রাফিক্স চিপ তথা GPU ও ডিজাইন করে । তাদের Cortex A53 ১৪ ন্যানোমিটার টেকনোলোজির তৈরি চিপসেট। আর একে কুয়ালকম এর স্ন্যাপড্রাগন ৪৩৫ চিপসেট এর সাথে তুলনা করা যেতে পারে।স্মার্টফোনটিতে গ্রাফিক্স প্রোসেসিং ইউনিট হিসেবে রয়েছে ARM এর Mali T720 GPU। Cortex A53 চিপসেটটি চার কোর বিশিষ্ঠ একটি কোয়াডকোর প্রোসেসর। যেটি ১.৪৫ গিগাহার্জ ক্ষমতাসম্পন্ন।

চিপসেটটি ৬৪ বিট ক্ষমতাসম্পন্ন। তাই এর ক্যালকুলেশন স্পীড, সচরাচর অন্যান্য স্মার্টফোন প্রোসেসর যেগুলো ৩২ বিট এগুলোর চাইতে বেশি।Ram হিসেবে থাকবে ৩ জিবি Ram,স্পেসিফিকেশন থেকে জানা যায় এটি একটি DDR3 Ram। ইন্টারনাল মেমোরি থাকছে ১৬ জিবি – তবে ১২৮ জিবি পর্যন্ত মেমেরি এক্সপান্ড করা যাবে।

ক্যামেরা

ওয়ালটন স্মার্টফোনটির ক্যামেরাতে একটু বেশি নজর দিয়েছে। দামের তুলনায় ক্যামেরা স্পেসিফিকেশন তুলনামূলক ভালই বলা চলে। চলুন ক্যামেরা সম্পর্কে সংক্ষেপে জানা যাক।

প্রাইমারি ক্যামেরাঃ রিয়ারে মূলত থাকছে একটি ১৩ মেগাপিক্সেল সিঙ্গেল ক্যামেরা। এটি ব্যাক ইলুমিনেশন/ইলুমিনেটেড সেন্সর যুক্ত তথা BSI সেন্সরযুক্ত ক্যামেরা। আর BSI সেন্সর মূলত ছবির কালার এমাউন্ট কে বাড়িয়ে দেয়,আর সেই কারনে লো-লাইটেও এই BSI ক্যামেরার কারনে তুলনামূলক ভালো কালার যুক্ত ছবি পাওয়া যায়। ফোকাস এর জন্য থাকছে PDAF (Phase Detection Auto Focus)। আর এটি মূলত একটি ফিচার যার কারনে ছোট-বড় অবজেক্টকে ক্যামেরাটি সহজে ফোকাস করে।ক্যামেরাটির এপার্চার f/2.2।রয়েছে সিঙ্গেল এলইডি ফ্লাস।

ক্যামেরাটির সেটিংস থেকে হোয়াইট ব্যালেন্স, ISO ইত্যাদি নিয়ন্ত্রন করা যাবে। স্লো মোশন,লেখা ট্রানস্লেশন,স্মার্ট সীন,নাইট মোড, জিআইএফ এর বিশেষ কতগুলো ক্যামেরা মোড।ডুয়াল ক্যামেরা না থাকায় অপটিকাল জুমের বদলে এতে ডিজিটাল জুম সুবিধা দেয়া হয়েছে। তাই ছবি তোলার সময় জুম করলে দৃশ্যপট ফেটে যাওয়া স্বাভাবিক।

আর ভিডিও রেকর্ডিং এর ক্ষেত্রে ১৯২০*১২৮০ পিক্সেলে সম্পূর্ন হাই ডেফিনেশন তথা এইচডি ভিডিও রেকর্ডিং করতে পারবেন। আর ভিডিও রেকর্ডিং এর ক্ষেত্রে আকর্ষনীয় স্লো মোশন ফুটেজ ক্যাপচারিং ফিচার থাকছে।

সেকেন্ডারি ক্যামেরাঃ আমার কাছে এই স্মার্টফোনটির মূল আকর্ষন মনে হচ্ছে এর সেকেন্ডারি ১৬ মেগা পিক্সেল সেলফি ক্যামরা। সেলফি ক্যামেরাটির সাথেও রয়েছে একটি সিঙ্গেল এলইডি ফ্লাশ।এটিও একটি BSI সেন্সর যুক্ত ক্যামেরা। একই ভাবে রয়েছে PDAF (Phase Detection Auto Focus) সুবিধা।বর্তমানে এক ব্যাপক সেলফি মুখী স্মার্টফোন ইউজারদের কথা মাথায় রেখে ওয়ালটন এই স্মার্টফোনটি তৈরি করেছে। ১৬ মেগাপিক্সেল ক্যামেরা সেলফি লাভারদের জন্য যথেষ্ঠ। এর এপার্চার f/2.0।

প্রাইমারি ও সেকেন্ডারি ক্যামেরা দুটিতেই রয়েছে 5p লেন্স। দামের হিসেবে ক্যামেরা স্পেসিফিকেশন বলতে গেলে ভালোই।ক্যামেরা গুলো দিয়ে তোলা ছবি ,

This slideshow requires JavaScript.

নেটওয়ার্ক ও কানেক্টিভিটি

এটি একটি ৪জি LTE সাপোর্টেড ডিভাইস। একটি সেপারেট এসডিকার্ড স্লটসহ দুটি ন্যানো সীম কার্ড স্লটে দুটি ৪জি ন্যানো সীমকার্ড সাপোর্ট করবে। ব্লুটুথ ৫ ইতিমধ্যে এলেও, ডিভাইসটিতে দেয়া রয়েছে ব্লুটুথ ৪ ভার্সন।যাই হোক, ডিভাইসটি ওয়্যাললেস ডিসপ্লে সাপোর্টেড, সুতরাং আপনি ক্রোমকাস্ট ব্যবহার করে, আপনার টিভির সাথে কানেক্টেড করে ডিসপ্লে শেয়ার করতে পারবেন।

ব্যাটারি

সম্পূর্ন ডিভাইসটিকে ব্যাকআপ দিবে একটি ৪০০০ এমএএইচ লিথিয়াম পলিমার ব্যাটারি। লিথিয়াম পলিমার ব্যাটারির কারনে ব্যাটারির কারনে যে অতিরিক্ত ওজন হয়, সে সমস্যাটি থাকছে না আর লিথিয়াম পলিমার ব্যাটারির আকারও হয় ছোট। তবে পারফর্মেন্স লিথিয়াম আয়ন ও পলিমার ব্যাটারির বলতে গেলে একই।আর ৪০০০ এমএএইচ ব্যাটারির ফলে এভারেজ ১.৫ দিন ব্যাটারি ব্যাকআপ পাওয়া যাবে।

পরিশেষে

১৫ হাজার টাকার বাজেটে – স্পেসিফিকেশন এর হিসেবে ডিভাইসটি কিনে ফেলা খারাপ হবে না।লং টাইম ব্যবহারের চিন্তা করলে- তুলনামূলকভাবে অনাসায়ে কয়েকবছর ব্যবহার করার মত ফোন এটি। সফটওয়্যার আপডেট এর কথা বলতে গেলে ওয়ালটন থেকে যদি অপারেটিং সিস্টেম আপডেট বা অন্য যেকোন সিস্টেম আপডেট বা বাগ ফিক্স আপডেট দেয়া হয় ; তবে তা Over The Air তথা OTA ফিচারটির মাধ্যমে ফোনের ভেতর থাকা Wireless Feature টির মাধ্যমে নেয়া যাবে।হেভি গেমিং এর জন্য পারফেক্ট বলা না গেলেও, টুকটাক ছোট,বড় গেমিং এর ক্ষেত্রে কোন সমস্যা হবে না।

এখন এই বাজেটে আপনি এটি কিনবেন কিনা সিদ্ধান্ত আপনার। আপনি দেশীয় ব্র্যান্ড এর মোবাইল কেনার কথা ভাবেন, তবে এটি কিনতে পারেন। এখানে স্মার্টফোনটির একটি ডিসেন্ট রিভিউ তুলে ধরা হয়েছে।স্মার্টফোনটির কি কি দিক ভালো লাগল নিচে মতামতে জানাতে পারবেন। আর রিভিউটি শেয়ার করে ছড়িয়ে দিতে পারেন আপনার বন্ধুদের মাঝে। সাথে আরো কোন ফোনের রিভিউ পেতে চাইলে নিচে কমেন্ট করে আপনার রিকোয়েস্ট আমাদের জানাতে পারেন।

label, , , ,

About the author

কোন জ্ঞান অর্জন করে সেটা মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দেয়ার মধ্য দিয়েই সার্থকতা । আমি মোঃ তৌহিদুর রহমান মাহিন । ভালোবাসি প্রযুক্তিকে , আরও ভালোবাসি প্রযুক্তি সম্পর্কে বেশি বেশি জানতে- জানাতে। নিয়মিত মানসম্মত প্রযুক্তি বিষয়ক আর্টিকেল উপহার দেয়ার প্রত্যয়ে আছি টেকহাবস এর সাথে ।

18 Comments

  1. Siam November 20, 2017
    • তৌহিদুর রহমান মাহিনAuthor November 20, 2017
  2. সিয়াম একান্ত November 20, 2017
    • তৌহিদুর রহমান মাহিনAuthor November 20, 2017
      • Abid November 21, 2017
        • সিয়াম একান্ত November 21, 2017
          • Abid November 21, 2017
    • Moynul islam November 20, 2017
      • তৌহিদুর রহমান মাহিনAuthor November 21, 2017
        • Pranto November 21, 2017
          • Abid November 21, 2017
          • তৌহিদুর রহমান মাহিনAuthor November 21, 2017
        • তৌহিদুর রহমান মাহিনAuthor November 21, 2017
  3. Rafi Rafsan November 21, 2017
    • তৌহিদুর রহমান মাহিনAuthor November 21, 2017
  4. তৌহিদুর রহমান মাহিনAuthor November 21, 2017
  5. Roni Ronit November 21, 2017
  6. Rihan November 21, 2017